Aerial view of a part of the Metiabruz neighbourhood

একটা মেয়ে ছিল। ধরুন তার নাম গুড়িয়া। বাবা মায়ের আদরের মেয়েরা তো বাবা মাদের কাছে গুড়িয়াই হয়। মেয়েটা স্কুলে যেত, স্কুলে বন্ধুদের সাথে খেলত। তার একটা যৌথ পরিবার ছিল। সেখানে তার একটা দাদা ছিল, সে তাকে খুব আদর করত। সেখানে তার একটা ছোট ভাইঝি ছিল। ভাইঝির সাথে বাড়িতে খেলত। মাঝে মাঝে মেয়েটা আনমনা হয়ে যেত। মায়ের কথা মনে পড়ত তার তখন। তার তো মা নেই। অন্যদের মা আছে তারা তাদের মায়ের কাছ থেকে কত আদর পায়। সে তো পায়না। তার তো মা নেই। অবশ্য খানিক পরেই মন খারাপটা কেটে যেত, যখন তার বাবা এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। তার বাবা তাকে খুব ভালোবাসত।

ঘিঞ্জি গলির মধ্যে দশ বাই দশের একটা ছোট্ট ঘরে তাদের বাবা মেয়ের ছোট্ট সংসার। মেয়েটা লজেন্স খেতে ভালোবাসত। কমলা লেবু লজেন্স। বড় বড় দোকানে ক্যাডবেরি, ডেয়ারী মিল্কের প্যাকেটগুলো দেখেছে সে। দারুণ ছবি দেওয়া। খেতে ইচ্ছা হয় খুব। কিন্তু উপায় নেই। তার বাবা কর্পোরেশানের সামান্য সাফাই কর্মী, ক্যাজুয়াল স্টাফ। কাজ থাকলে টাকা পায়, না থাকলে পায়না। তাই তার বাবার ক্ষমতা নেই তাকে ক্যাডবেরি ডেয়ারী মিল্ক কিনে দেবার। মাঝে মাঝে বাবা তাকে দেয় এক টাকা, দুটাকা। তখন গিয়ে পাড়ার মোড়ের দোকান থেকে কমলালেবু লজেন্স কিনে আনে। নিজে খায়, ছোট ভাইঝিকেও খাওয়ায়। মাঝে মাঝে যখন দাদা আসে দাদাও তাকে লজেন্স কেনার টাকা দেয়।

কিন্তু একদিন মেয়েটা হঠাৎ হারিয়ে গেল। কেউ আর তাকে কোথাও দেখতে পেলনা। পাড়ার মোড়ের দোকানটাতেই গেছিল লজেন্স কিনতে। কিন্তু আর ফিরলনা। তার বাবা, মামা আর কাকা অনেক খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু কোথাও পেলনা।

 

FIR Copy filed in Garden Reach Police Station

তারা পুলিশের কাছে গেল। পুলিশ বলল দেখ মেয়ে গেছে কোথাও, এসে যাবে। কিন্তু মেয়েটির বাবা জানাল যে তার মেয়ে খুবই ছোট। এই সবে ১৫ তে পরেছে। সে ঐ বড়জোর পাড়ার মোড়ের দোকান অব্দিই যেতে পারে। তার বেশী দূরে কোথাও তো যাবেনা। কোনদিন যায়নি। খুবই বাধ্য মেয়ে। অবশেষে অনেক জোরাজুরির পরে পুলিশ একটা জিডি নিয়ে ছেড়ে দিল।

মেয়েটির বাবা বিনোদ দাস রোজ একবার করে যায় পুলিশ থানাতে মেয়ের খোঁজ কিছু পাওয়া গেছে কিনা জানতে। কিন্তু পুলিশ থানাতে সে কোন পাত্তাই পায়না। তবে বিনোদ দাশ বসে থাকেনা। সে খুঁজতে থাকে তার মেয়েকে। এদিকে ওদিকে একে তাকে ছবি দেখিয়ে জানতে চায় মেয়েকে তারা দেখেছে কিনা।

এইভাবেই একদিন জানতে পারে যে কাছের মহল্লার একটি ছেলেকে দেখা গেছিল সেদিন তার মেয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে। সেখানে আরও লোক ছিল ছেলেটির সাথে।

মেয়েটির বাবা সাথে সাথে গিয়ে জানায় পুলিশকে। পুলিশ সব শুনে মেয়েটির বাবাকে বলে যে জায়গার কথা সে বলছে সে বড় ভয়ংকর জায়গা। সেটা দেশের মধ্যে অন্য দেশ। সেখানে যাওয়ার সাধ্য তাদের নেই। তারা কেউ গ্যাস খেয়ে বিনোদ মেহতা হতে চায়না। তাদের পক্ষে সম্ভব নয় ঐ জায়গা থেকে বিনোদ দাসের মেয়ে গুড়িয়া (নাম পরিবর্তিত) ঐ জায়গা থেকে বার করে আনা। বিনোদ দাস পুলিশের হাতে পায়ে ধরে, কান্নাকাটি করে। কিন্তু পুলিশ জানিয়ে দেয় কিছু করা সম্ভব নয়।

Copy of the GD

২০১৭ সালের ১০ই জুন, ঐ দিন মেয়েটি হারিয়ে গেছিল। তারপর থেকে বিনোদ দাস আর তার মেয়েকে দেখেনি। সে জানেনা তার মেয়েটা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। বেঁচে থাকলে কি অবস্থায় আছে, কিছুই জানেনা সে। পুলিশ হাত তুলে দিয়েছে।

বিনোদ দাস মুখ্যমন্ত্রীর অফিসেও যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে অফিস তো মস্ত অফিস সেখানে এক সামান্য সাফাই কর্মীর প্রবেশাধিকার নেই। তাই বিনোদ দাশ নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও সেখানে গেছে। কিন্তু গিয়েও মেয়েকে পায়নি।

বিনোদ দাশ নিজের প্রাণের কথা ভাবেনা। কিন্তু বিনোদ দাশ ভাবে সে মরে গেলে তার মেয়েকে উদ্ধার করবে কে? তাই সে বেঁচে থেকে লড়াই চালিয়ে যায়।

বিনোদ দাশ হাইকোর্টে তার আবেদন নিয়ে গেছে। যদি কোর্ট তাকে সাহায্য করে।

বিনোদ দাশ এখন আশায় আশায় বসে আছে, সে আবার তার মেয়েকে ফিরে পাবে। মেয়ে এসে আবার তার কোলে মাথা রেখে মায়ের কথা জানতে চাইবে।

Court order

বিনোদ দাশকে কেউ-কেউ বোঝানোর চেষ্টা করে যে মেয়ে নিজের ইচ্ছাতেই চলে গেছে। বিনোদ দাশ তার মেয়েকে ভুলে যাক। বিনোদ দাশ তাদের বলে, বেশ তো মেয়ে যদি নিজের ইচ্ছাতে গেছে যাকনা। কিন্তু সে গিয়ে কি তার বাবাকে ভুলে যাবে? তা তো নয়। অন্ততপক্ষে ফোন করেও তো একটা খবর দেবে ঠিক আছে কিনা। কই তাও তো দেয়না। না বিনোদ দাশ এসব শুনবেনা। সে চায় তার মেয়েকে সামনে পেতে। তার ১৫ বছরের মেয়েকে।

বিনোদ দাশের ‘গাঁও’ বিহার। সেখানেও লোকে অনেক কথা বলছে। তবে সে নিয়ে বিনোদ দাশ বিশেষ মাথা ঘামায়না। সে এই কলকাতাকেই নিজের শহর বলে মনে করে। এখানে তো বাবুবিবিরা অনেক কিছু নিয়ে কিংবা হয়তো সবকিছু নিয়েই বলে, তাহলে কি আর তারা গুড়িয়ার কথা বলবেনা? বলবে বৈকি একদিন। কিন্তু হায় বিনোদ দাশ এই শহরে জন্মেও এখনও এই শহরকে চেনেনি। তাই তো তাকে যখন পুলিশ প্রতিদিন চাপ দেয় কেস তুলে নিতে।

এমনকি মিন্টু মিঞা যে তার মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ, তাকে লালাবাজারে গুড়িয়ার ভাতিজি শনাক্তও করে। জোর গলায় আট বছরের মেয়েটি জানায় এই ছেলেটিই গুড়িয়াকে ধরে নিয়ে গেছে। তারপরেও পুলিশ ছেলেটিকে এরেস্ট করেনা বা মেয়েটিকে রেস্কিউ করেনা। তাকে বলা হয় যে সে কোন সাহসে কেস করেছে? কে তাকে টাকা দিয়েছে কেস করার।

Court order

বুদ্ধিজীবীরা বলবেনা। কারণ গুড়িয়া “ইজ আ হিন্দু। জাস্ট আ ব্লাডি হিন্দু”। কাজেই সেখানে পেট্রোডলার নেই। তাই গুড়িয়ার কথা বলার সময় তাদের নেই। তারা বরং সেই সময়ে দাস ক্যাপিটাল পড়ে কাটিয়ে দেবে।

বিনোদ দাশ তাই এখন তাকিয়ে আছে তার মতোই সাধারণ মানুষদের দিকে তাকিয়ে। তারা যদি একটু আওয়াজ তোলে। যদি তারা পারে মেয়েটাকে তার ঘরে ফিরিয়ে দিতে। আজ দশমাস হয়ে গেল সে তার মেয়েকে দেখেনি। আর কতদিন?

বিনোদ দাশের চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে আমার মেয়েটার কি দাম নেই? তার হয়ে কেউ কেন কিছু বলেনা। কেন কেউ তাকে তার মেয়ের খোঁজ দেয়না। তার মতো সাধারণ মানুষদের জন্য কি কেউ নেই এই পশ্চিমবাংলায়।

এই পোস্ট দেওয়ার পরে হয়ত আমার উপরে আক্রমণ নেমে আসবে। সরকারী এবং বেসরকারী দুই তরফ থেকে। কারণ যাদের বিরুদ্ধে লড়তে নামছি তারা খুবই শক্তিশালী এবং প্রশাসনের মদতপুষ্ট। হয়ত আমাকে মিথ্যে মামলায় জেলে দেওয়া হবে কিংবা জোর করে পোস্ট ডিলিট করতে বাধ্য করা হবে।

কিন্তু তাতে এই ঘটনা মিথ্যে প্রমাণ হয়ে যাবেনা। আমার লড়াই বাংলার অত্যাচারিত হিন্দুদের জন্য চলতে থাকবে। আপনাদের উপরেই আমার ভরসা এই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।