Friday 23 October 2020

ডেনমার্কে পূজো

[dropcap]জ[/dropcap]ন্মসূত্রে আমি শিলচরের। তাই পূজো বলতে সবচেয়ে প্রথম শিলচরের পূজোটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছোটোবেলা পূজোতে আমরা কোথাও যেতাম না — শিলচর ছেড়ে। মনে হত শিলচরের পূজোই পৃথিবীর সেরা। কলকাতায় পূজো দেখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিয়ের আগে কখনো কলকাতার পূজো দেখিনি। আর দেখার ইচ্ছেও হয়নি। কারণ, বললাম যে! মনে হত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পূজো শিলচরেই হয়।

1782510_874347159271967_5366882112562599174_o

দেখতে-দেখতে জীবনের বাইশটা বছরের পূজো কাটিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসলাম। শ্বশুরবাড়ী কলকাতায়। বিয়ের পর কলকাতার পূজো হয়ে গেল আমার পূজো। তখন কলকাতার পূজো হয়ে গেল বিশ্বের সেরা পূজো! কিন্তু কোথাও যেন একটা মন খারাপ থেকেই যেত। দুটো বছর কলকাতায় পূজো কাটিয়ে যখন নিজেকে ওই পূজোর সঙ্গি ভাবতে শুরু করলাম তখনই বরের কাজের সূএে আমাকে ওর সাথে পাড়ি দিতে হল ভারতের রাজধানী দিল্লিতে।

আমার জীবনের আরেকটা অধ্যায়। শিলচর আর কলকাতার পূজোর থেকে দিল্লির পূজোটা অনেকটাই অন্যরকম। দিল্লিতে আমার আরেকটা শব্দের সাথে পরিচয় হল — প্রবাসী। আমরা নাকি প্রবাসী বাঙ্গালী! অনেকবার নিজেকেই জিজ্ঞাসা করতাম,ভারতবর্ষে জন্ম নিয়ে আমরা প্রবাসী কি ভাবে হলাম? উত্তরটা আজও পাইনি। কিন্ত ধীরে-ধীরে দিল্লির পূজোটা নিজের হতে লাগল। ছেলে কবিতা আবৃত্তি করত। ওর কবিতার কম্পিটিশনের জন্য নানা যায়গায় আমরা যেতে লাগলাম। অনেক বন্ধু হল। কিছু বন্ধু এমন জায়গা নিয়ে নিল, যে হয়ত, সারা জীবনই ওদের ভুলতে পারব না। দিল্লিতে আমাদের বাড়ি পেছনেই পূজো হত। ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গত। সেই চেনা মুখগুলি… যাদের কথা লিখতে গিয়েও চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এগার বছর কেটে গেল দিল্লিতে। এখনও আমি দিল্লির পূজোকেই নিজের পূজো বলি।

আবার আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু । এবার হাসবেন্ডকে কোপেনহেগেন এ আসতে হল। আজ কয়েক বছর ধরে আমি সত্যিকারের প্রবাসী। মে মাসের এক ফুটফুটে দিনে পাড়ি দিলাম ডেনমার্ক এর কোপেনহ্যাগেন এ। বিশ্বের মানচিএে ডেনমার্ক কে খুঁজে পেতে হলে উত্তর ইউরোপের দিকটায় যেতে হবে। কোপেনহ্যাগেন এ মাত্র তিন বছর আগে পূজো শুরু হয়েছে,তার আগে এখানকার বাঙ্গালীদের পূজো উপভোগ করতে জার্মানির কোনো শহরে যেতে হত।

মা'র সামনে লেখিকা
মা’র সামনে লেখিকা

২০১২য় প্রথম দূর্গা পূজো শুরু হয় কোপেনহ্যাগেন এ। প্রথমবার মূর্তি গড়িয়ে মা’র পূজো করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই ঘট পূজো দিয়েই মা’র পূজো শুরু হয়। তাই ২০১৩র প্রথমেই কুমারটুলিতে অর্ডার যায়। এবার যে চিন্ময়ী কে মৃন্ময়ী রূপে আনতেই হবে এখানে! দশভূজার সাথে আমারও প্রথম আগমন হয় এই পূজোতে। কাউকেই চিনি না; সবাই আমার কাছে নতুন আর আমি তাদের কাছে অচেনা। কিন্তু পূজোতে বাড়িতে বসে থাকাটা হয়ত সব বাঙ্গালীদের কাছেই একটা দুঃস্বপ্ন। তাই প্রথম দিনই সবার সাথে বলতে পারেন জোর করেই মিশে গেলাম।

এখানে পূজো দেশের পূজোর মত দিনে-দিনে করা যায়না। শনি-রবিবার ছাড়া এখানে হল পাওয়া যায়না। তার উপর পূজো যে করবেন, বাকী সবার ছুটিছাটা, সুবিধে-অসুবিধেটাও আমাদের মাথায় রাখতে হয়। পূজোরবেশির ভাগ জিনিষই কলকাতা থেকে আসে। পান পাতা, দুব্বো, বেলপাতা সবকিছুর জন্যেই আমরা নির্ভরশীল কলকাতার উপর। মাকে আমরা ১০৮টা পদ্ম দিয়ে পূজো করি।ওই পদ্মগুলো আনা হয় নেদারল্যান্ড্স থেকে।

ষষ্ঠীর বোধন দিয়ে পূজো শুরু। ষষ্ঠীর পূজো শেষ হওয়ার আগেই আমরা সপ্তমীর তোড়জোড় শুরু করে দিই। প্রত্যেক বেলায় মা’র ভোগ আমরা নিজেদের বাড়ি থেকে বানিয়ে আনি। ষষ্ঠীতে প্রথমে পায়েস দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। সপ্তমীর ভোগে থাকে লুচি, পাঁচ রকমের ভাজা, আলুর দম, হাতে গড়া কালাকান্দ বা ক্ষীরের সন্দেশ আর পায়েস। গণেশের জন্য নারকেল নাড়ুও বাড়িতে বানানো হয়। এখানে ভারতীয় মিষ্টান্নর কোন দোকান নেই। তাই আমাদের একমাএ ভরসা নিজের হাতে তৈরী মিষ্টি। রসগোল্লা, চমচম, লেডিকিনী, রাজভোগ, বেসনের লাড্ডু — সবই নিজেদের হাতে বানানো হয়।

নানা রকমের ফল ও চালের নৈবিদ্য মিষ্টি দিয়ে পূজো করা হয়। অষ্টমী আর নবমীতে খিচুড়ী ভোগ এবং তার সাথে নানারকমের ভাজা, ছানার ডালনা, আনারসের চাটনি আর গোবিন্দভোগ চালের পায়েস। ভোগের জন্যে কোন নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা থাকে না আমাদের। যে যেটা পারে ওটাই আমরা মাকে নিবেদন করি।

পেট পুজোর ব্যবস্থা
পেট পুজোর ব্যবস্থা

বাঙ্গালী মানেই ভুরিভোজ। দূর্গাপূজো মানেই খাওয়া-দাওয়া। এত কথার সাথে যদি এই কথাটা উল্লেখ না করি তবে পূজো পরিক্রমাটাই শেষ হবেনা। পূজোর হলটা হয়ে যায় তিন দিনের জন্যে আমাদের বাড়ি। সকাল থেকে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া আর কাজ নিয়ে মেতে থাকি আমরা। আমাদের সবার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় caterer (পরিবেশক) কে দিয়ে। ছ’বেলার খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে চার বেলা হয় নিরামিষ। ষষ্ঠীর দুপুর বেলায় থাকে সোনা মুগের ডাল, বেগুনী, ফুলকপির ডালনা, চাটনি, পাপড় ভাজা এবং লেংচা। রাতেই হয় সপ্তমী, তখন খাওয়া হয় খিচুড়ী, কুমড়ো ভাজা, ফুলকপির পকোড়া, লাবড়া, টমেটোর চাটনি ও পায়েস। অষ্টমীতে হিং এর কচুরী, ছোলার ডাল, ধোকার ডালনা, ফ্রুট্স চাটনি, পান্তুয়া। নবমীর রাতে হয় পোলাও, পটলের দোলমা, পনির কোফতা আর পায়েস। দশমীর দুপুর বেলাটায় হয় জমপেশ্ খাওয়া-দাওয়া। মুসুর ডাল,ঝুরঝুরে আলুভাজা, চিংড়ির মালাইকারি,পাঠার মাংসের ঝোল, দই আর রসগোল্লা। রাতে বিরিয়ানী, চিকেন চাপ এবং ফিরনী দিয়ে শেষ হয় আমাদের ভুরি পরিক্রমা। আমাদেরর কিছু উৎসাহী মেম্বারদের সৌজন্যে কলকাতা স্টাইলে বেশ কটি স্টল থাকে, যেখানে পাওয়া যায় ডোসা, পাটিসাপটা, কলকাতার চিকেন রোল, ঘুঘনি।

10620087_875963499110333_8679399374438614932_o

খাওয়া-দাওয়ার কথা তো অনেক হল,এবার একটু সাজগোজ এর কথায় আসি। দেশের মত পূজোর বাজারের ভিড়টা এখানে আর অনুভব করতেই পারি না। তবে বাঙ্গালী হয়ে নতুন জামা পরবনা, ওরকম কি আর হয়? অনলাইন কেনাকাটা করে নানারকম শাড়ি-গয়না চলে আসে আমাদের কাছে। এক একদিন এক এক রকমের জামাকাপড় পড়ে আমরা ঐ হলটাকেই বানিয়ে নিই ফ্যাশন র‍্যাম্প।

বাচ্চাদের জন্য আয়োজিত হয় নানারকমের প্রতিযোগিতা। আর বিকেলবেলায় হয় নাটক, নাচ, গান, কবিতা দিয়ে জমজমাট অনুষ্ঠান। সপ্তাহের শেষটা ভালই কেটে যায় আমাদের। ঢাক বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে দেশের পূজোকে ধরে আনি আমাদের কোপেনহ্যাগেন এর চার দেওয়ালের মধ্যে।

চোখের পলকে কেটে যায় তিনটে দিন। কলকাতার পূজো শুরু হওয়ার কদিন আগেই মা কোপেনহ্যাগেনএ চলে আসেন। তাই দেশে যখন সবাই পূজোতে আনন্দ করে, তখন আমরা এখানে যে যার কাজে ব্যস্ত থাকি। বাড়িতে ফোন করলেই ঢাকের আওয়াজটা ভেসে আসে কানে। কখন যে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে বুঝতেও পারি না। আবার কখনো হয়তো ঢাকের আওয়াজে ভাঙ্গবে আমার ঘুম। বাড়ির পেছনের শিউলি ফুলের গাছটাও হয়ত বসে আছে আমার অপেক্ষায়…

Baishali Ghosh
Baishali Ghosh
Food blogger based in Copenhagen, Denmark

You may be interested in...

All