Sorry, you have Javascript Disabled! To see this page as it is meant to appear, please enable your Javascript! See instructions here
Home Literature Story গন্ধলেবুর গাছ

গন্ধলেবুর গাছ

হারান জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা গন্ধরাজ লেবুর গাছটার উপরে ফেলে দেয়। নিমেষে গাছটা আগুন ধরে নেয়। চুমকি একটু পিছিয়ে আসে। হারান একবার অস্ফুস্টে বলে, 'ভালো থাকিস, মা।'

0

— বাবা, দিদিকে নেবেনা?

হারান চুমকির কথার কোন উত্তর না দিয়ে পোঁটলাটা আরেকটু শক্ত করে বাঁধে। দরকার না থাকলেও আরেকটা গিঁট দেয়।

চুমকি আবার বলে, “ও বাবা, দিদিকে নেবেনা? আমরা যদি ইন্ডিয়া চলে যাই, দিদি আমাদের খুঁজে পাবে কি করে?”

“তোর জিনিষ সব গুছিয়ে নিয়েছিস? বই খাতাগুলো নেওয়ার কোন দরকার নেই। খালি কিছু জামা কাপড় নিয়ে নে,” বলে হারান কোঁচড়ের ভেতর থেকে আরেকবার টাকাগুলো বার করে গুনে নেয়। বর্ডারে প্রায় হাজার পাচেক লাগবে দুই দিকে। তার কাছে প্রায় হাজার দশেক টাকা আছে। ইন্ডিয়া গিয়েও কিছু খরচা আছে। ওখানে হারানের এক তুতো দাদা আছে। নদীয়ার দিকে থাকে। আপাতত গিয়ে তার কাছেই উঠবে। তারপর দেখা যাক।

“বাবা, একবার তুমি বড় হুজুরের সাথে কথা বলনা, এক সপ্তাহ তো হল দিদিকে ওরা নিয়ে গেছে। এবার একবার বলে দেখনা তুমি। জমি বাড়িও তো সব ওদের দেওয়া হল। এখনও কি ওরা দিদিকে আটকে রাখবে?” কথাগুলো বলে চুমকি তাকিয়ে থাকে হারানের দিকে।

হারান একবার চুমকির দিকে তাকায়। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। দশটা নাগাদ আসরফ আসবে। বড় হুজুরই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আসরফ তাদের বর্ডার পার করিয়ে দেবে।

চুমকি আর রুমকি, এই দুই মেয়ে নিয়েই হারানের সংসার। সাধনা মারা যাওয়ার পরে সেই বুকে-পিঠে করে মানুষ করেছে দুই মেয়েকে। রুমকির ১৭ হয়েছে, আর চুমকি এবার ১৪তে পরল। এই রুমকিই গত এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। বা বলা ভালো খাতায় কলমে নিখোঁজ। পুলিশের কাছে গেছিল হারান। পুলিশের কথাতেই বড় হুজুর বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন সব।

রুমকি এখানেই থাকবে, কিন্তু চুমকিকে হারান নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারবে। হ্যাঁ, চুমকির বিনিময়ে তার যেটুকু জমিজমা ছিল সেসব বড় হুজুরকে লিখে দিতে হয়েছে। বদলে বড় হুজুর বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন যাতে তারা নির্বিঘ্নে বর্ডার পেরিয়ে যেতে পারে।

একসময় এই তল্লাটে সাহাদের বেশ নাম ছিল। বাজারে বড় মুদীর দোকান ছিল তাদের। একান্নবর্তী পরিবারের ব্যবসা। বাবারা তিন ভাই মিলে ভালোই দাঁড় করিয়েছিলেন। তারপর দেশভাগ হল। দুই কাকা ইন্ডিয়া চলে গেল। দোকানও দখল হল। এখন এই কয়েক বিঘা জমি, এই দিয়েই তাদের চলে যাচ্ছিল। খুব একটা অভাব ছিলনা। হ্যাঁ, দেশভাগ হওয়ার পরে সম্মান কিছুই ছিলনা। কিন্তু তাও নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে যাওয়ার সাহস করতে পারেনি। যতই লোকে তাকে ঠারেঠোরে শোনাকনা কেন, তার মত হিন্দুদের সবটুকু প্রেম খালি ইন্ডিয়ার জন্য, তারপরেও হারান সাহস করতে পারেনি। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অচেনা অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে পারেনি।

হারান একটা বিড়ি ধরাল। চুমকিকে একবার ডাকল। কোন সাড়া পেলনা। আবার ডাক দিল, কোন সাড়া নেই। গেল কোথায় আবার মেয়েটা? আর পারা যায়না এদের নিয়ে! হারান বিড়িটা উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ায়।

ঘরের ভেতরে দেখল, সেখানেও নেই মেয়েটা। রান্নাঘরের দিকে একবার দেখল। যদিও আজ এক সপ্তাহ তাদের বাড়িতে হাঁড়ি চড়েনি। তাও দেখল রান্নাঘরের দিকটা একবার। নাহ, এখানেও নেই। তাহলে কি বাগানের দিকে গেল? বাড়ির পেছনে এক চিলতে জায়গায় দুই মেয়েতে মিলে খুব যত্ন করে বাগান বানিয়েছিল। জবা, নয়নতারা, কিছু লঙ্কার গাছ, চালে লাউ। রুমকিটা লাউ শাক খেতে খুব ভালোবাসত।

বাগানে এসে দেখল চুমকি দাঁড়িয়ে আছে গন্ধরাজ লেবুর গাছটার কাছে।

হারান গিয়ে চুমকির মাথায় হাত রেখে বলল, “মন খারাপ করিসনা, মা। দিদি ভালোই থাকবে এখানে।”

চুমকি কিছু বলেনা খানিকক্ষন। তারপর বলে, “তোমার মনে আছে এই গাছটায় কিছুতেই লেবু হচ্ছিলনা। দিদি কত কিছু করেছিল। তোমার মনে আছে দিদি কেমন মাঝেমাঝেই লেবুপাতা হাতে ঘষে হাত শুকত, বাবা?”

হারান কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। দরজার পেছনের কোণে কেরোসিনের হ্যারিকেনটা রাখা ছিল। সেটা তুলে নিয়ে বাইরে আসে। তারপর গাছের উপরে খানিকটা কেরোসিন তেল ঢেলে দেয়।

কোঁচড়ের ভেতর থেকে দেশলাইটা বার করে। দেশলাইটা একটু মিইয়ে গেছে। দু’ তিনবার ঘষার পরে কাঠিটা জ্বলে ওঠে। হারান জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা গন্ধরাজ লেবুর গাছটার উপরে ফেলে দেয়। নিমেষে গাছটা আগুন ধরে নেয়। চুমকি একটু পিছিয়ে আসে। হারান একবার অস্ফুস্টে বলে, “ভালো থাকিস, মা।”

ঘটনা

বাংলাদেশের আজকের কাগজে ২২ ফেব্রুয়ারী ২০০৩ সালে প্রকাশিত খবরে জানা যায় কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে স্কুল ছাত্রী প্রণতি রাণী মজুমদারকে কবির হোসেন ওরফে মনা মিঞা তার সহযোগীদের নিয়ে অপহরণ করে।

খবরে প্রকাশ ৬ই ফেব্রুয়ারী প্রণতির বাড়িতে সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠান চলছিল। পরদিন ভোর সাড়ে ৬টায় প্রণতি বাড়ির পুকুর পাড়ে গেলে জীবনপুরের মনা মিঞা তার তিন সহযোগীকে সাথে নিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে তাকে অপহরণ করে। মনা মিঞার সহযোগী ছিল বাবুল, লোকমান, রেজ্জাকসহ আরও দুই অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি।

প্রণতির বাবা থানায় ডায়েরি করতে গেলে পুলিশ প্রথমে ডায়েরি নিতে চায়নি, তারপরে সংবাদপত্রে এই ঘটনা নিয়ে লেখালেখি শুরু হলে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু পুলিশে অভিযোগ জানানোর কারনে মনা মিঞার ঘনিষ্ঠরা ক্রমাগত প্রণতির পরিবারকে হুমকি দিয়ে চলেছে।

তথ্যসূত্র শ্বেতপত্র, ঘটনা — ১৪৫০

প্রসঙ্গে সিএএ — লঘু সম্পাদকীয়

১১ ডিসেম্বর রাজ্যসভায় পাস হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী ২০১৯ বিল। সংসদের দুই কক্ষেই ভোট অঙ্কে পাস হয় বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের পেশ করা এই বিল। লোকসভায় এই বিল ৩১১ জন সাংসদের সমর্থন পেয়ে পাস হয়। পরে রাজ্যসভায় এই ১২৫ জন সাংসদের সমর্থন পেয়ে আইনে পরিবর্তিত হয়। বিজেপির সমর্থনে সংসদে অকালি দল ও জেডিইউ এগিয়ে আসে। জোটের বাইরে থেকে ওয়াই এসআর কংগ্রেস, বিজেডি, টিডিপি, এআইডিএমকের মতো দল সমর্থন করে।

নতুন আইন অনুযায়ী ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত। তবে এই নাগরিকত্ব কেবলমাত্র হিন্দু, খ্রিস্টান, পারশি, শিখ, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই পাবেন কারণ ইসলাম শাসিত দেশগুলিতে মুসলমানদের উপরেও অত্যাচার হতে পারে, একথা মানতে ক্ষমতাশীল বিজেপি নারাজ। এছাড়া এদেশে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি অথবা আফগানিস্তানের মুসলমান কর্মসংস্থানের খোঁজে আসে অথবা সন্ত্রাসবাদের তাগিদে ― অত্যাচারিত হয়ে নয় ― শাসকমহলের এরকমই বিশ্বাস। কাজের খোঁজে এসে বিদেশি মুসলমান এদেশের মুসলমান সহ প্রত্যেকটি ভারতবাসির অধিকারে ভাগ বসাবে। আর সন্ত্রাসবাদিদের ঢুকতে দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠেনা।

নিতান্তই যদি বাংলাদেশ, পাকিস্তান অথবা আফগানিস্তানে আহমেদিয়া বা শিয়ারা অত্যাচারিত হয়ে থাকে, তবে ইসলাম শাসিত দেশগুলিতে তার বিহিত করা ইসলামের দায়িত্ব বলে মনে করে বিজেপি। কারণ দেশকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষিত করার সময় শুধুমাত্র সুন্নি সম্প্রদায়ের জন্য রাষ্ট্র বলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান অথবা আফগানিস্তানের তৎকালীন সরকার নিজ-নিজ দেশকে চিহ্নিত করেনি বা পরবর্তীকালে তাদের সংবিধানে এইরূপ কোন সংশোধন করা হয়নি।

NO COMMENTS

For fearless journalism